সময় এবং তারিখ

ঢাকা,বাংলাদেশ 

Saturday, July 11, 2026

মৃত্যুর মোড় থেকে ফিরে আসা !

 

মৃত্যুর মোড় থেকে ফিরে আসা


ছুটি মানেই পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অদ্ভুত টান। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা...

আমি, দিগন্ত কুমার রায়, জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার, আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস, মগবাজার, ঢাকায় কর্মরত। ২০২৬ সালের ঈদুল আযহার ছুটি; বাড়িতে গিয়ে ৩০ মে
২০২৬ তারিখ শ্বশুরবাড়ি, পশ্চিম ধওলাই, হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) নিমন্ত্রণে যাওয়া হয়। সঙ্গে ছিল আমার সহধর্মিণী গৌরী রানী, কন্যা হিয়া রায় হৃদি এবং আমার ভাই পল্লব কুমার রায়।

খাওয়া-দাওয়া শেষে প্রথমে ভাইকে বাড়িতে পৌঁছে দিই। এরপর বাড়ি থেকে আমার মা’কে মামার বাড়িতে রেখে আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিই, কারণ পরদিন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। কারন, ১ জুন ২০২৬ তারিখ অফিস খুলবে।

আমি, আমার স্ত্রী ও আমার কন্যা সহ রাত আনুমানিক ১০.৩০
মিনিটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই। রাস্তা একদম ফাঁকা ছিল। আমরা কৈটারী, চামটাহাট পেড়িয়ে মোটা সন্নাসীর থান নামক স্থান পেরিয়ে রাস্তার একটি মোড়ে পৌঁছিলাম। সময় তখন আনুমানিক রাত ১০.৫০ মিনিট । চলন্ত অবস্থায় সেই মোড়ে অপর প্রান্ত থেকে আসা এক সাইকেল আরোহীর সঙ্গে আমাদের স্কুটারটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হল। স্কুটার রাস্তায় পড়ে গেলো।

আমার স্ত্রী রাস্তার ওপর পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তা দেখে মেয়েটি আমার ভয় পেয়ে যায়, আর আমি মুহূর্তের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ি।

ঠিক তখনই কয়েকজন অচেনা বাইকার এগিয়ে আসেন। তারা আমাদের নিকটস্থ ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা হয়। আমি আমার শ্যালক মিঠুন রায়কে ফোন দিলে সে খুব তাড়াতাড়ি সেই ডাক্তারের চেম্বারে চলে আসে। পরবর্তীতে আমার অন্য এক শ্যালক মৃনাল রায় (মামা শ্বশুরের ছেলে) আমাদের সাথে যুক্ত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে মিঠুন রায় সহ সবাই শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যাই। আমাদের এরকম অবস্থা দেখে সবাই বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পরদিন থেকে আমার স্ত্রীর চিকিৎসা শুরু হয়।

এবং আমি দায়িত্বের তাগিদে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। সেই রাত আমাকে শিখিয়েছে—জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ পরিবার, আর আপনজন। যারা বিপদে পড়লে শত ব্যস্ততার মাঝে একটি ফোনকল পেয়ে ছুটে আসেন, রাত ১২টায় ঘুমে গিয়েও খবর পেয়ে ছুটে চলেন সেই ফোনকলের দিকে। আমি ধন্য, আমি তৃপ্ত এমন পরিবার পেয়ে।

আমি কৃজ্ঞতা জানাই, সেই রাতের অচেনা বাইকারগণকে, সর্বপ্রথম যারা নিঃস্বার্থভাবে আমাকে, আমার পরিবারকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিল ডাক্তারে কাছে। তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

Thursday, July 9, 2026

বিয়ে মিস, ভোজে হিট !

 বিয়ে মিস, ভোজে হিট!


কর্পোরেট অফিসে চাকরি করতে এসে একটা জিনিস খুব ভালোভাবে শিখেছি—অফিসে মিটিং যত গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ “খাওয়ার মিটিং”! আমি দিগন্ত কুমার রায়, জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

আমার ইমিডিয়েট বস ফাহাদ ভাইয়ের বিয়ে। বাসা সরিষাবাড়ি, জামালপুর। অফিসের সবাইকে আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

কয়েকদিন পর ফাহাদ ভাই অফিসে ফিরলেন। নতুন বরের সেই আলাদা উজ্জ্বলতা যেন পুরো ফ্লোরটাই আলোকিত করে দিল। অফিসে এসেই তিনি স্টেট-ফরওয়ার্ড ঘোষণা দিলেন,

আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবাবী ভোজ-এ বিয়ের খাওয়া হবে। কেউ অজুহাত দিলে এইচ.আর. ফাইলে নোট হয়ে যাবে!”

আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। মনে মনে ভাবলাম, “অজুহাত দেওয়ার সাহস কার!”

দাওয়াতের দিন সবাই যেন অফিসের নির্ধারিত কাজ তারাতারি শেষ করার অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নেমে গেল। আমি যথারীতি দায়িত্বের কাজগুলো সুন্দরভাবে শেষ করে বের হলাম।

রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই ফাহাদ ভাই বললেন,

—“আজ কোনো সিনিয়র-জুনিয়র নেই। সবাই সমান। তবে বিল দেওয়ার সময় কেউ সমান হওয়ার চেষ্টা করবেন না!”

এই একটা বাক্যেই পুরো টেবিল হেসে উঠল।

জাহেদ ভাই যথারীতি শান্ত স্বভাবের মানুষ। মেন্যুকার্ড হাতে নিয়ে এমনভাবে দেখছেন যেন কোম্পানির নতুন এইচ.আর. পলিসি যাচাই করছেন।

আমি মজা করে বললাম,

—“ভাই, খাবার অডিট করছেন নাকি?”

তিনি মুচকি হেসে বললেন,

—“ভুল অর্ডার দিলে পরে আফসোস করতে হবে।”

এমন সময় শিহাব ভাই বললেন,

—“খাবার শুরু করার আগে ঘোষণা করছি—যে যার প্লেটের খাবার শেষ করবেন। পরে কেউ যদি বলে ‘আরেকটু বিরিয়ানি চাই’, সেটা হবে পুনর্বিবেচনার আবেদন। তবে সিদ্ধান্ত হবে রেস্টুরেন্টের আদালতে!”

আমরা সবাই হেসে কুটিকুটি।

তিনি আবার বললেন,

—“আর যদি কেউ অন্যের বিরিয়ানিতে হাত দেন, তাহলে সেটা হবে ‘দখল মামলা’। আমি কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবী হতে রাজি আছি!”

রেস্টুরেন্টের পাশের টেবিলের মানুষও আমাদের হাসি দেখে তাকিয়ে রইল।

এদিকে ইমতিয়াজ ভাই বললেন,

—“যা ভালো আছে, সবকিছু আনেন। আজকে কারও প্লেটে যেন খালি জায়গা না থাকে।”

ওয়েটার একবার আমাদের দিকে, একবার তাঁর দিকে তাকাল। মনে হলো, এই টেবিলটাই আজ রেস্টুরেন্টের ভিআইপি টেবিল।

খাবার আসতে শুরু করল। কাচ্চি, বোরহানি, সালাদ, পানীয়—টেবিল ধীরে ধীরে এমন রূপ নিল যে মোবাইল বের করে ছবি না তুলে থাকা কঠিন।

ঠিক তখনই মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার ঢুকলেন।

তিনি স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বললেন,

—“আরে, তোরা তো দেখি আমারে না ডাইকা ভোজ শুরু কইরা দিছস! এইডা কিন্তু মাইন্ন্যা লওয়া যায় না!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

তিনি চেয়ারে বসেই বললেন,

—“ওই ওয়েটার ভাই, প্লেটটা একটু বড় দেন। ছোট প্লেটে আমার মন ভরে না!”

তারপর তাঁর সেই পরিচিত মজার কথাবার্তায় পুরো পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

এদিকে রুদ্র ভাই মোবাইল বের করে বললেন,

—“একটা গ্রুপ ছবি হবে। তবে কেউ যেন এমন ভাব না নেয় যে কালকের পত্রিকায় ‘নবাবী ভোজে মানবসম্পদ বিভাগের খাদ্য সমাহার’ শিরোনাম হবে!”

আবারও হাসির রোল।

অফিসের অন্যান্য সহকর্মীরাও কম যান না।

একজন বললেন,

—“আজকে যে যত বেশি খাবে, কাল অফিসে সে তত কম কাজ করবে।”

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন,

—“না ভাই, এত খাওয়ার পরে চেয়ার থেকেই উঠতে পারব কি না, সেটাই আগে দেখা দরকার।”

এদিকে ফাহাদ ভাই সবার প্লেট লক্ষ্য করছেন।

আমার প্লেটে বিরিয়ানি একটু কম দেখে বললেন,

—“দিগন্ত, এইচ.আর.-এ কাজ করেন বলে কি খাবারেও নিয়মনীতি? আরেকটু নেন।”

আমি বললাম,

—“ভাই, পরে ডেজার্টের জন্য জায়গা রাখতে হবে।”

সবাইতো হেসে মশগুল।

শেষে এল পানীয় (কোকাকোলা)।

আমরা ভেবেছিলাম অনুষ্ঠান শেষ।

কিন্তু না।

ফাহাদ ভাই আবার ঘোষণা দিলেন,

—“আজকে যে সবচেয়ে বেশি খেয়েছে, সে আগামী এক সপ্তাহ অফিসে ক্ষুধার কথা বলতে পারবে না!”

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“আমি আপত্তি জানাচ্ছি। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব!”

সুমন স্যার সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“আদালতে যাওনের আগে আরেক প্লেট কাচ্চি খাইয়া যাও!”

রেস্টুরেন্ট আবারও হাসিতে মুখর হয়ে উঠল।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু পেট ভরে খাইনি; স্মৃতির ঝুলিও ভরে নিয়েছি।

কারণ হলো—কর্পোরেট জীবনে কিছু মিটিং মিনিটসে লেখা থাকে, আর কিছু মিটিং লেখা থাকে মানুষের মনে। ফাহাদ ভাইয়ের বিয়ের পরের এই নবাবী ভোজ ছিল ঠিক তেমনই।

 

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

স্যার থেকে ভাই—এক ঐতিহাসিক পদোন্নতি !

 

“স্যার থেকে ভাই—এক ঐতিহাসিক পদোন্নতি!”

 

আমি দিগন্ত কুমার রায়। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কর্পোরেট অফিসে যখন প্রথম যোগদান করি, তখন আমার কাছে অফিস মানেই ছিল—যাকে দেখি, তাকেই “স্যার”।

সকালে অফিসে ঢুকেই সবাইকে বলতাম—

—“সুপ্রভাত স্যার! কেমন আছেন ?”

ডানদিকে তাকিয়ে—

—“স্যার, কোন কাজটি আগে করবো?”

বামদিকে তাকিয়ে—

—“স্যার, এই ফাইলটা আপডেট করতে হবে কি না?”

ফলাফল এমন দাঁড়ালো যে, একদিন অফিসে যদি তিনজন একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতেন, আমি একবার “স্যার” বললেই তিনজনই একসাথে উত্তর দিতেন—

—“হ্যাঁ দিগন্ত, বলেন!”

আমি তখন বুঝতেই পারতাম না, আসলে কোন স্যারকে ডাকলাম!

আমাদের রুমে তখন অফিসিয়াল ডেস্ক ছিল ফাহাদ ভাই, ইমতিয়াজ ভাই, শিহাব ভাই এবং রুদ্র ভাইয়ের।

একদিন দুপুরে ফাইল আপডেট করতে গিয়ে ফাহাদ ভাইকে বললাম,

—“স্যার, একটি কাগজে স্বাক্ষর প্রয়োজন।”

অন্যদিকে ইমতিয়াজ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“দিগন্ত, একটা প্রশ্ন করি?”

আমি একটু ভয় পেলাম।

—“জি… স্যার!”

তিনি হেসে বললেন,

—“দ্যাখেন, আমরা যদি আপনাকে ভাই মনে করি, আর আপনি যদি আমাদেরকে স্যার ডাকেন, তাহলে সমীকরণে ভারসাম্য থাকে?”

আমি হতচকিত হয়ে বললাম,

—“সম্ভবত থাকে না… স্যার!”

রুমজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।

এবার তিনি অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে ঘোষণা দিলেন,

—“একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সভা এখনই হোক।”

আমি তো প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম!

তিনি বললেন,

—“এজেন্ডা একটাই—দিগন্ত, এখন থেকে সবাইকে ‘ভাই’ ডাকতে পারবে কি না ?”

রুদ্র ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“আমি মিডিয়ার লোক। এই সংবাদটি ইতিবাচকভাবে প্রচার করা উচিত। জনগণ জানতে চায়!”

আবার হাসির ঢেউ।

ফাহাদ ভাই বললেন,

—“আমি প্রস্তাব সমর্থন করছি।”

এদিকে শিহাব ভাই বললেন,

—“কারো আপত্তি থাকলে এখনই জানান। পরে কিন্তু আপিল গ্রহণ করা হবে না!”

আমি তখনও যেন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।

কেউ কোনো আপত্তি করল না।

ইমতিয়াজ ভাই টেবিলে কলম ঠুকে বললেন,

—“সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। আজ থেকে দিগন্ত সবাইকে ভাই বলবে।”

আমার মনে হলো, যেন চাকরিতে দ্বিতীয়বার নিয়োগপত্র পেলাম!

ইমতিয়াজ ভাই বললেন,

—“ভাই ডাকেই দায়িত্ব বেশি, সম্মানও বেশি।”

তারপর শিহাব ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,

—“শিহাব ভাই।”

তিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,

—“অভিনন্দন! আজ থেকে আপনি আমাদের ভাই ব্রাদারহুডের স্থায়ী সদস্য। ভর্তি ফি নাই!

সবাই আবার হেসে উঠল।

কয়েকদিন পর এইচ.আর.এম এন্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যারের কক্ষে কাজের প্রয়োজনে গেলাম।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—“শুনেছি তোমার পদোন্নতি হয়েছে!”

আমি অবাক।

—“স্যার! আমি তো কোনো পদোন্নতি পাই নাই!”

তিনি হেসে বললেন,

—“পদবি নয়, সম্বোধনের পদোন্নতি। স্যার থেকে ভাই—এটাও কিন্তু কম কিছু নয়।”

ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন।

এর কিছুদিন পর এক বিকেলে শিহাব ভাইয়ের রুমে গেলাম।

ঠিক তখনই মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার আসলেন।

দরজা খুলেই বললেন,

—“আরে! তোমরা এখনো শুধু গল্প করছো? চলো, আমার রুমে। খালি পেটে মিটিং করলে সিদ্ধান্ত উল্টো হয়ে যায়!”

তার সেই মজার আঞ্চলিক ভঙ্গির কথায় সবাই হেসে উঠল।

আমরা গেলাম।

টেবিলে দেওয়া হলো চা, কফি, সিঙ্গারা, সমুচা, কেক, ফল আর ঠান্ডা পানীয়।

আমি অবাক হয়ে বললাম,

—“স্যার, এত আয়োজন কেন?”

সুমন স্যার হাসতে হাসতে বললেন,

—“রাজনীতি শিখিয়েছে—মানুষের মন জিততে হলে আগে পেট জিততে হয়!”

ঠিক তখনই রুদ্র ভাই মোবাইল তুলে বললেন,

—এই দৃশ্যের একটা ছবি হলে দারুণ হতো। ক্যাপশন দিতাম—‘ভাই সম্বোধনের ঐতিহাসিক চুক্তি উদ্‌যাপন!’

ফাহাদ ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—ক্যাপশনটা সংশোধন করেন। লিখেন—‘অফিসে সম্মান কমেনি, দূরত্ব কমেছে।’

ইমতিয়াজ ভাই মাথা নেড়ে বললেন,

—এই কথাটাই সবচেয়ে মূল্যবান।

আমি চারদিকে তাকালাম।

যাদের একসময় “স্যার” বলে ডাকতাম, আজ তারা সবাই আমার “ভাই”।

সম্বোধন বদলেছে, কিন্তু সম্মান একটুও কমেনি।

বরং সেই একটিমাত্র শব্দ—“ভাই”—অফিসের সম্পর্ককে আরও আন্তরিক, আরও মানবিক করে তুলেছে।

আর আজও যখন নতুন কেউ অফিসে এসে সবাইকে “স্যার” বলে ডাকে, তখন আমার দিকে তাকিয়ে ফাহাদ ভাই মুচকি হেসে বলেন—

—দিগন্ত, প্রস্তুত হন। মনে হচ্ছে আবার একটি ‘ঐতিহাসিক ভাই অনুমোদন সভা’ ডাকতে হবে!

এরপর পুরো অফিসে একসাথে যে হাসির শব্দ ওঠে, সেটাই বুঝিয়ে দেয়—কর্মক্ষেত্র শুধু কাজের জায়গা নয়, সুন্দর সম্পর্কেরও এক অনন্য ঠিকানা। 


সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com


Wednesday, July 8, 2026

নবাবী ভোজে বিয়ের ভোজ


-কর্পোরেট অফিসে সাধারণত দুই ধরনের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—একটা সার্কুলার, আরেকটা খাওয়ার খবর ।

সেদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমি যথারীতি নিজের ডেস্কে বসে নীরবে অফিসিয়াল কাজ করছিলাম ।

ঠিক তখনই অফিসের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি বার্তা এল—

“আমার বিয়ে উপলক্ষে আজ দুপুরে সবাইকে ‘নবাবী ভোজ’-এ আন্তরিক দাওয়াত। — মো. ইকবাল হোসেন রুদ্র।”

মেসেজটি পড়েই পুরো অফিসে যেন ঈদের চাঁদ দেখা গেল !

আমি চুপচাপ মোবাইলটা আবার টেবিলে রেখে কাজে মন দিলাম ।

কিছুক্ষণ পরেই ফাহাদ ভাই আমার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন ।

— “দিগন্ত, আপনি এখনও কাজ করছেন?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “জি ভাই ।”

তিনি বললেন,

— “দ্যাখেন, কর্মক্ষেত্রে সময় ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ । আর খাওয়ার দাওয়াতও একটি কর্পোরেট ইভেন্ট । যে আগে যাবে, সে গরম খাবার পাবে । এটি শুধু অভিজ্ঞতা নয়, বৈজ্ঞানিক সত্য ।”

আমি বুঝলাম, এই যুক্তির পর আর কোনো আপিল নাই ।

এদিকে জাহেদ ভাই নিঃশব্দে নিজের কাজ শেষ করছেন । যাতে নির্ভুলভাবে কাজগুলো উপস্থাপন করতে পারেন ।

 

হঠাৎ লিগ্যাল অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-এর ম্যানেজার শিহাব ভাই এসে ঘোষণা দিলেন—

— “শুনুন সবাই! আজ আমি আইনগতভাবে ঘোষণা করছি—যে ব্যক্তি বিরিয়ানি শেষ হওয়ার পর উপস্থিত হবে, তার প্লেটে শুধু সালাদ থাকবে ।”

সবাই হেসে উঠল ।

তিনি আবার বললেন—

— “উকিলের কাছে সত্য বললে ফি কমে না, কিন্তু স্ত্রীর কাছে সত্য বললে বাজারের বিল বেড়ে যায়!”

হাসতে হাসতে কারও চোখে পানি, কারও হাতে চায়ের কাপ কাঁপছে ।

ঠিক তখনই এইচ.আর.এম এন্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-এর পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যার নিজের কক্ষ থেকে বের হলেন ।

মুখে সেই পরিচিত মৃদু হাসি ।

তিনি বললেন—

— “আচ্ছা, সবাই একসঙ্গে যাবা । কেউ যেন বাদ না পড়ে । আজ আনন্দের দিন ।”

স্যারের এই একটি বাক্যেই পুরো টিমের মুখে প্রশান্তি নেমে এল ।

এমন সময় ইমতিয়াজ ভাই প্রবেশ করলেন ।

সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— “আজকে কেউ বিল নিয়ে চিন্তা করবেন না । রুদ্র ভাই দাওয়াত দিছেন, আর যদি অতিরিক্ত আইসক্রিম লাগে, সেটাও হবে । আনন্দের দিনে হিসাব চলে না ।”

আমি মনে মনে ভাবলাম—এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে যদি কেউ আবহাওয়ার পূর্বাভাসও দিত, তাহলে বৃষ্টি হওয়ার আগেই ছাতা নিয়ে বের হতাম!

এরই মধ্যে মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার এসে পুরো পরিবেশ বদলে দিলেন ।

তিনি হাসতে হাসতে বললেন—

— “আরে তোমরা এখনও অফিসে বসে আছ? এই যে দিগন্ত, এত নিয়ম মেনে চললে একদিন বিরিয়ানিও তোমার অনুমতি নিয়ে ঠান্ডা হয়ে যাবে !”

তার সেই মজার ঢঙে বলা কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল ।

তারপর তিনি ঘোষণা দিলেন—

— “আজকের সভার একমাত্র এজেন্ডা—পেট ওভারলোড করে খাওয়া !”

অবশেষে আমরা সবাই পৌঁছালাম নবানী ভোজ রেস্তোরাঁয় ।

আগেই উপস্থিত নববিবাহিত রুদ্র ভাই ।

হাসিমুখে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছেন ।

একবার মিডিয়ার খবর নিচ্ছেন, আবার অতিথিদের বসাচ্ছেন ।

আমি মজা করে বললাম—

— “রুদ্র ভাই, আপনি তো দেখছি নিজের বিয়ের চেয়েও দাওয়াতের কাভারেজ ভালো করছেন !”

তিনি হেসে উত্তর দিলেন—

— “পাবলিক রিলেশন অফিসারের বিয়ে, ভাই! এখানে অতিথির হাসিই সবচেয়ে বড় সংবাদ ।”

টেবিলে একে একে খাবার আসতে শুরু করল ।

কাবাব, নান, বিরিয়ানি, রোস্ট, রেজালা, সালাদ, কোমল পানীয়—দেখে মনে হচ্ছিল খাবারগুলোও আজ উৎসব করতে এসেছে ।

ফাহাদ ভাই বললেন—

— “সবার প্লেটে সমান পরিমাণ খাবার যাবে । সাম্য বজায় রাখতে হবে ।”

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন—

— “আইন অনুযায়ী যার প্লেটে কাবাব কম, সে আপিল করতে পারবে ।”

জাহেদ ভাই শান্তভাবে নিজের প্লেট সাজিয়ে বসে আছেন ।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—

— “ভাই, কিছু বলছেন না কেন?”

তিনি মুচকি হেসে বললেন—

— “আগে মুকুল স্যার খাওয়া শুরু করুক, তারপর আমি ।”

মুকুল স্যার সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— “আজ কেউ অফিসের কথা বলবে না । শুধু খাবে ।”

আমি মনে মনে ভাবলাম—এই একটি নির্দেশ যদি প্রতি মাসে একবার দেওয়া হতো, তাহলে কর্মীদের মনোবল আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেত।

খাওয়ার এক পর্যায়ে সুমন স্যার বললেন—

— “এই যে দিগন্ত, এত আস্তে খাচ্ছ কেন? তুমি খাবারেরও সার্ভিস রুলস মেনে খাচ্ছ নাকি?”

আমি হেসে বললাম—

— “স্যার, নিয়ম মেনে খেলে হজমও নিয়ম মেনে হয় ।”

সবাই আবারও হেসে উঠল ।

খাওয়া শেষে রুদ্র ভাই বললেন—

— “আপনাদের হাসিমুখটাই আমার বিয়ের সবচেয়ে বড় উপহার ।”

আমি চারদিকে তাকালাম ।

অফিসে আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন পদে কাজ করি—কেউ পরিচালক, কেউ ম্যানেজার, কেউ অফিসার । কিন্তু এই টেবিলে আমাদের পরিচয় একটাই—

আমরা সহকর্মী, আমরা এক পরিবারের মানুষ ।

ফিরতি পথে আমার মনে হলো—

ফাইলের পৃষ্ঠা যেমন একসঙ্গে বাঁধা না থাকলে পূর্ণাঙ্গ হয় না, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানের মানুষও শুধু দায়িত্বে নয়, হাসি, আন্তরিকতা আর একসঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তে সত্যিকারের পরিবার হয়ে ওঠে ।

আর সেই দিনের “নবানী ভোঁজ” শুধু একটি দাওয়াত ছিল না—ছিল অন্য রকম অনুভূতি ।

 

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com


প্রমোশনের বুফে !

প্রমোশনের বুফে !


২০২৩ সালের একটি প্রমোশন পরবর্তী ঘটনা ।

অফিসে ঢুকেই শুনলাম চারদিকে একটাই আলোচনা—“আজকে কিন্তু বড় খবর!”

আমি, দিগন্ত কুমার রায়, যথারীতি চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছি । আমার নীতি একটাই—কম কথা, বেশি কাজ । অফিসের নিয়ম মেনে চলি, আর দায়িত্ব পেলে সেটাকে নিজের কাজ মনে করেই করি ।

হঠাৎ আমার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন ফাহাদ ভাই।

“দিগন্ত, খবর জানেন?”

আমি মাথা নাড়লাম । না ভাই !

তিনি বললেন—

“দেখেন, প্রতিষ্ঠানে যখন যোগ্য লোকের প্রমোশন হয়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, প্রতিষ্ঠানেরও অর্জন । আর এই অর্জনের সামাজিক উদযাপন হওয়া উচিত । তাই আজকে কোনো অজুহাত চলবে না । খাওয়া দিতে হবে ।”

ফাহাদ ভাই একবার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তাঁকে আর বদলানো কঠিন । কারণ তিনি সচরাচর ভেবেচিন্তে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকেন, প্রামাণিত । তাঁর কথায় এমন যুক্তি থাকে যে শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি হয়ে যায় । অধীনস্তদের জন্য তিনি যেন সত্যিই এক বিশাল বটগাছের ছায়া ।

ঠিক তখনই অফিসে ঢুকলেন নতুন প্রমোশন পাওয়া চার নায়ক—ফয়েজ ভাই, রুদ্র ভাই, ইমতিয়াজ ভাই এবং শিহাব ভাই ।

রুদ্র ভাই এসেই সবার সঙ্গে এমনভাবে কুশল বিনিময় শুরু করলেন যেন অফিস নয়, বহুদিন পর আত্মীয়দের ঈদের মিলনমেলা ।

ইমতিয়াজ ভাই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললেন,

“আজকে কেউ বিল নিয়ে চিন্তা করবেন না । আজ আনন্দের দিন ।”

আমি মনে মনে ভাবলাম, “বিলের কথা তো কেউ এখনো বলেনি। কিসের বিল?”

এরই মধ্যে শিহাব ভাই ঘোষণা দিলেন—

“আজ সন্ধ্যায় সবাই গ্রীন লাউঞ্জ, বেইলী রোড । বুফে পার্টি।”

সারা অফিসে যেন আনন্দের ঢেউ ।

এমন সময় এইচ.আর.এম এন্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যার কক্ষে প্রবেশ করলেন ।

তিনি হাসিমুখে বললেন,

“তোমাদের আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগছে । তবে একটা কথা মনে রেখো—খাবারের চেয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের মূল্য অনেক বেশি ।”

স্যারের কথায় এমন আন্তরিকতা ছিল- সবাই হাততালি দিয়ে উঠল ।

দুপুরের দিকে আমি নতুন যোগদানকৃত স্টাফদের ফাইল দেখছি ।

ঠিক তখনই সহকারী পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার প্রবেশ করলেন।

তিনি রুমে প্রবেশ করেই বললেন,

“কিরে দিগন্ত! এত সিরিয়াস মুখ কেন? মনে হচ্ছে বুফের আগে ডায়েট শুরু করে দিয়েছিস নাকি?”

তারপর নিজের স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি মেশানো ভাষায় সবাইকে হাসাতে লাগলেন । তাঁর সেই মজার কথাগুলো এতটাই প্রাণবন্ত ছিল যে পুরো বিভাগে হাসির রোল পড়ে গেল ।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ।

সবাই পৌঁছে গেলাম গ্রীন লাউঞ্জে ।

ফয়েজ ভাই যেন পুরো অনুষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজার ।

কে কোথায় বসবে, কে আগে খাবার নেবে, কে ছবি তুলবে—সব তাঁর নখদর্পণে।

আমি চুপচাপ এক কোণে বসে ছিলাম ।

ফয়েজ ভাই এসে বললেন,

“দাদা, আজকে আপনার দায়িত্ব—খাবারের আগে সবাই আছে কি না সেটা নিশ্চিত করবেন ।”

আমি দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিতি মিলিয়ে ফেললাম ।

ফাহাদ ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“দেখছেন? এই জন্যই দায়িত্ববান লোকের আলাদা মূল্য আছে ।”

ঠিক তখনই শিহাব ভাই শুরু করলেন তাঁর হাস্যরসাত্মক কথা-

তিনি বললেন,

—“বুফেতে একটা নিয়ম করা উচিত—যে সবচেয়ে বেশি ডেজার্ট খাবে, সে পরের প্রমোশনের আগে ডায়েট চার্ট জমা দেবে!”

পুরো অফিস হেসে উঠল ।

তারপর তিনি আরও যোগ করলেন,

“বুফেতে তিন ধরনের মানুষ থাকে ।

এক নম্বর—যারা খাবার দেখে ।

দুই নম্বর—যারা ছবি তোলে ।

তিন নম্বর—যারা প্রথম দুইজনের অপেক্ষায় থেকে শেষে প্লেট ভর্তি করে!”

রুদ্র ভাই বললেন,

“আমি তো তিন নম্বর দলের আজীবন সদস্য!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল ।

 

ইমতিয়াজ ভাই বললেন,

“আজকে প্লেট ছোট হলে রিফিল হবে, কিন্তু আনন্দ ছোট হলে রিফিল হবে না ।”

এমন সময় জলিল স্যার ধীরে ধীরে বললেন,

“তোমরা এত হাসছো, হিসাবের খাতা কিন্তু হাসে না।”

সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ ।

তারপর তিনি নিজেই মুচকি হেসে বললেন,

“ভাগ্য ভালো, আজ বিল তোমাদের না!”

আবার হাসির বিস্ফোরণ ।

খাওয়া শুরু হলো ।

কেউ কাবাব নিচ্ছে, কেউ বিরিয়ানি, কেউ স্যুপ, কেউ ডেজার্ট, যার যা ইচ্চ্ছা খাচ্ছে ।

আমি অল্প অল্প করে সবকিছু নিচ্ছিলাম ।

সুমন স্যার টেবিলের ওপার থেকে চিৎকার করে বললেন,

“এই দিগন্ত! এত কম খাবি? অফিসে তোকে দেখে মনে হয় সারা মাস নিরামিশ খাস, আজ একটু তেলের তৈরি খাবার খা! খেলে মরবি না;  না হয় দুইদিন কম বাঁচলি!”

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,

“ওনাকে বেশি খেতে দিয়েন না । কাল অফিসে এসে যদি বলে ‘বুফে নীতিমালা’ বানাতে হবে, তাহলে কিন্তু শেষ!”

হাসতে হাসতে আমারও চোখে পানি এসে গেল ।

খাওয়ার শেষে ছবি তোলার পালা ।

রুদ্র ভাই সবাইকে এমনভাবে দাঁড় করালেন যেন জাতীয় পুরস্কার গ্রহণের ছবি তোলা হচ্ছে ।

ফয়েজ ভাই বললেন,

“এখন সবাইকে একটু ভদ্রভাবে হাসতে হবে!”

ঠিক তখনই শিহাব ভাই বললেন,

“যারা দ্বিতীয়বার আইসক্রিম খেয়েছেন, তারা একটু বেশি হাসুন!”

আবারও অট্টহাসি।

শেষে মুকুল স্যার সবাইকে দেখে বললেন,

“আজকের সবচেয়ে বড় অর্জন যারা প্রমোশন পেয়েছে, তাদের দেওয়া এই সুন্দর আনন্দঘন মুহূর্ত”

আমি নীরবে চারপাশে তাকালাম ।

ভাবলাম—

পদবি মানুষকে বড় করে না ।

একসঙ্গে হাসতে পারা, একে অপরকে সম্মান করা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবই একটি অফিসকে পরিবারে পরিণত করে ।

সেদিন গ্রীন লাউঞ্জের বুফে শেষ হয়েছিল ।

কিন্তু সেই সন্ধ্যার হাসি, কৌতুক, সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতির স্বাদ আজও যেন মনের প্লেটে গরম গরম পরিবেশন হয় ।

 

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

Tuesday, July 7, 2026

কর্পোরেট অফিসে একদিন

কর্পোরেট অফিসে একদিন

 

সেদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল । আমি সফটঅয়্যারে কর্মীদের তথ্য আপডেট করে চিঠি-পত্র রেডি করছি স্বাক্ষরের জন্য । ঠিক তখনই ফাহাদ ভাই দ্রুত হেঁটে এসে বললেন,

— “দিগন্ত, আজ সকল চিঠি-পত্র স্বাক্ষর করাতে হবে, তারাতারি রেডি করেন । কিন্তু, একটা মজার ঘটনা ঘটেছে!”

আমি মাথা তুলে শুধু বললাম, — “কি ভাই?”

ফাহাদ ভাই বললেন, — “কেউ একজন পুরো অফিসে ‘Reply All’ দিয়ে লিখেছে— ‘যে ফ্রিজ থেকে আমার দই খেয়েছেন, তিনি দয়া করে অন্তত চামচটা ধুয়ে রাখবেন!’”

পুরো অফিসে তখন হাসির রোল।

ফাহাদ ভাই অবশ্য হাসির মধ্যে বললেন -

— “দইয়ের মূল্য দশ টাকা না একশ টাকা সেটা বিষয় না । বিষয় হলো ন্যায়বিচার । যার দই, তার দই । আর যার চামচ, তার চামচ!”

তার যুক্তির সামনে কেউ আর তর্ক করল না ।

এদিকে জাহেদ ভাই চুপচাপ বসে পুরো ই-মেইল থ্রেড বিশ্লেষণ করছেন । তিনি সবসময় পরিস্থিতি বুঝে কথা বলেন । কয়েক মিনিট পর শান্তভাবে বললেন,

— “ভাই, Reply All করেছে ভুলে । আসল উদ্দেশ্য ছিল একজনকে পাঠানো ।”

সবাই একসাথে বলল, — “আহা!”

ঠিক তখনই লিগ্যাল অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের শিহাব ভাই ঢুকলেন ।

তিনি পরিস্থিতি বুঝে বললেন,

— “আইন অনুযায়ী দইয়ের মালিকানা প্রমাণ করতে হলে প্রথমে ফ্রিজে থাকা দইয়ের সাক্ষী লাগবে!”

হাসির শব্দ থামার আগেই তিনি আবার বললেন,

— “যদি দই নিজে সাক্ষ্য দিতে পারত, তাহলে কোর্টে প্রথম প্রশ্ন হতো— ‘আপনি কি নিজ ইচ্ছায় খাওয়া হয়েছেন?’”

এবার এমন হাসি শুরু হলো যে পাশের বিভাগের লোকজনও উঁকি দিতে লাগল ।

আমি (দিগন্ত) হাসলেও রিপোর্ট ঠিকঠাক সাজিয়ে যাচ্ছিলাম।

দুপুরে পরিচালক (মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল) স্যারের কক্ষে সবাই উপস্থিত হলাম।

স্যার সবার কথা মন দিয়ে শুনলেন । তাঁর স্বভাবই এমন—নরম, ধৈর্যশীল ।

সব শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন,

— “একটা দইয়ের কারণে যদি সবাই একসাথে হাসতে পারে, তাহলে এটাও কর্পোরেট কালচারের অংশ । তবে পরেরবার নাম না লিখে ‘Reply All’ নয়।”

 সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল ।

ঠিক তখনই ইমতিয়াজ ভাই দরজা খুলে ঢুকলেন ।

গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,

— “সব লাইসেন্সের কাজ শেষ । আর দই যদি অফিসের সম্পদ হয়ে থাকে, তাহলে তারও একটা রেজিস্টার রাখা উচিত!”

কথাটা এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন যে কয়েক সেকেন্ড কেউ বুঝতেই পারল না তিনি মজা করছেন নাকি সত্যি ।

এরপর তিনিই বললেন,

— “চলো, আজ সবাইকে কফি খাওয়াই”

সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাততালি দিল ।

ঠিক তখন সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার অফিসে এসেই বললেন,

— “আরে এই যে! তোমরা দই নিয়ে মিটিং করছ? এইসব দুষ্টু লোকজনের জন্যই অফিসে ফ্রিজে তালা লাগাতে হয়!”

তারপর নিজের স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে কয়েকটি হালকা মজার আঞ্চলিক গালি ব্যবহার করলেন, যেগুলো শুনে কেউ অপমানিত হলো না; বরং পুরো রুম আবার হাসিতে ভরে গেল ।

তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন,

— “শুধু কফি ক্যা? আমার অফিসে চল । বিরিয়ানি, কাবাব, ডিম, মৌসুমী ফল, চা, কী খাবি—সব ব্যবস্থা আছে। খালি পেটে অফিসের নীতি শেখা যায় নাকি!”

আর ঠিক তখনই অফিস সহকারী কালাম ভাই ট্রে ভর্তি চা/কফি ও বিস্কুট নিয়ে রুমে ঢুকলেন। তিনি পরিচালক থেকে শুরু করে জুনিয়র স্টাফ—সবার সামনে সমান আন্তরিকতায় চা-কফি পরিবেশন করলেন।

হাসিমুখে বললেন,

— "স্যার, আগে এক কাপ চা হয়ে যাক। খালি পেটে মিটিং করলে সিদ্ধান্তও শুকনো হয়ে যায়!"

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,

— "কালাম ভাই, আপনার চা না থাকলে আমাদের মিটিংয়ের মিনিটসও ঘুমিয়ে পড়ত!"

হাসির রোল পড়ে গেল পুরো রুমে।

ফাহাদ ভাই মুচকি হেসে বললেন,

— "দেখো দিগন্ত, কর্পোরেট অফিসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ মানুষ হলো কালাম । তিনি পদবি দেখেন না; সবার জন্য একই হাসি, একই চা, একই বিস্কিট ।"

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম । সত্যিই, কালাম ভাই প্রতিদিন নীরবে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন । চা-কফি পরিবেশন থেকে শুরু করে অফিসের অন্যান্য কাজ—সব কিছুই করেন হাসিমুখে ।

 

এমন সময় সেলিম ভাই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন,

— "স্যার, ওয়াসরুমগুলো পরিষ্কার করে দিলাম । আর পাশের কনফারেন্স রুমেও চা দিয়ে আসলাম।"

শিহাব ভাই এবার বললেন-।

— "সেলিম ভাই, আপনার কারণে আমাদের অফিসের ওয়াসরুমে ঢুকলেও মনে হয় ফাইভ স্টার হোটেলে এসেছি!"

সবাই হেসে উঠল ।

সেলিম ভাই লাজুক হেসে বললেন,

— "স্যার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে সবাই ভালোভাবে কাজ করতে পারে । এটাই আমার আনন্দ।"

ইমতিয়াজ ভাই গম্ভীর মুখে বললেন,

— "একটা প্রতিষ্ঠানের মান শুধু কনফারেন্স রুম দেখে বোঝা যায় না; ওয়াসরুম দেখেও বোঝা যায় । সেলিম ভাই তার দায়িত্ব খুব ভালোভাবে পালন করছে।"

এদিকে রুদ্র ভাই ইতিমধ্যে সকল টিভি চ্যানেল, প্রিন্ট মিডিয়া, ফেসবুক ও ইউটিউবার—সবার সঙ্গে কথা বলেছেন ।

তিনি বললেন,

— “আমি খবর নিয়ে এসেছি। দইয়ের ঘটনা এখন পুরো অফিসের আলোচনার বিষয় ।

সবাই হাততালি দিল ।

ঠিক তখনি আমি (দিগন্ত) বললাম,

— “ভাই… আসলে একটা কথা বলি?”

সবাই তাকাল ।

বললাম..... যে,

— “Reply All-টা আমি পাঠাইনি । কিন্তু যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি পরে আমাকে বলেছিলেন— ‘Undo Send’ কোথায় পাই?”

পুরো রুম আবার হাসিতে ফেটে পড়ল ।

আমি শান্তভাবে বললাম,

— “পরেরবার পাঁচ সেকেন্ডের বদলে ত্রিশ সেকেন্ড Undo Send চালু করে দেব ।”

-আবার সবার মধ্যেই হাসি ।..........

দিনের শেষে মুকুল স্যার বললেন,

— “একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য হলো-পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, বিশ্বাস, কাজ করার দক্ষতা আর আনন্দঘন পরিবেশ—এই বিষয়গুলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।” সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধই আমাদের অফিসকে একটি পরিবার করে তুলেছে।"

আমি (দিগন্ত) চারদিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম;

—অফিসে পদবি আলাদা হতে পারে । কিন্তু সকলেই স্ব স্ব কর্মস্থলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, নীতিমালা করে, বিশেষ দক্ষতায়, কেউ প্রযুক্তি জ্ঞানে, কেউ সম্পর্ক দিয়ে, আবার কেউ এক কাপ চা/কফি কিংবা ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপহার দিয়ে কর্মদিবসকে সুন্দর করে তোলেন । সব মিলিয়েই আমাদের অফিস, আমাদের পরিবার ।


সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com