সময় এবং তারিখ

ঢাকা,বাংলাদেশ 

Thursday, July 23, 2026

রিজাইন লেটারের মহাযুদ্ধ

রিজাইন লেটারের মহাযুদ্ধ


আমি দিগন্ত কুমার রায়, সাধারণত খুব কম কথা বলি। সবাই বলে, "দিগন্ত ভাই কথা কম বলেন" । নিয়ম মেনে কাজ করা, দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করার সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করা, আর কোম্পানির নীতিমালা অনুসরণ করাই আমার অভ্যাস। তাই অফিসে কোনো ঘটনা ঘটলে আমি চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করি, তারপর মনে মনে ভাবি— "এটা নিয়ে একদিন কিছু লেখা যায় কিনা !"

সেদিন সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। হঠাৎ অফিসে গুঞ্জন উঠল— শিহাব ভাই নাকি চাকরি থেকে রিজাইন করেছেন!

(বলে রাখা ভালো। আমি প্রথম ওনার রিজাইনের বিষয়টি ফেসবুক পোস্ট থেকে দেখেছি।)

আমি অবাক! কারণ শিহাব ভাই মানেই অফিসের হাসির ফোয়ারা। লিগ্যালের মানুষ হয়েও এমনসব জোকস বলতেন যে, আদালতের বিচারকও শুনলে হয়তো বলতেন, "আগে একটু হেসে নিই, তারপর রায় দেব!"

একদিন তিনি মজা করে বলেছিলেন,
— "আইনজীবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন? বাসায় বউ যদি বলে, 'আপনি ভুল করেছেন', তখনও মনে হয়— Objection, Your Honor "

সবাই হেসে গড়িয়ে পড়েছিল।

কিন্তু, আর যাই হোক খবরটা সত্যি ছিল।

পরে জানা গেল, শিহাব ভাই প্রথমে নিজের পদত্যাগপত্র মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যার-এর হাতে দিয়েছিলেন।

মুকুল স্যার আমাদের অভিভাবক। এতটাই নরম স্বভাবের যে, কেউ ছুটি চাইলে আগে জিজ্ঞেস করেন,
— "কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?"

তিনি শিহাব ভাইকে এতটাই স্নেহ করতেন যে, রিজাইন লেটার দেখে বলেছিলেন,
— "আচ্ছা... এটা একটু পরে দেখি।"

"পরে দেখা" বলতে কী বুঝিয়েছিলেন, সেটা পরে সবাই বুঝল।

কেউ বলল, চিঠিটা টেবিলের ড্রয়ারে।

কেউ বলল, বাসার আলমারিতে।

কেউ আবার বলল,
— "স্যার সম্ভবত এটাকে সরকারি গোপন নথির মতো সংরক্ষণ করেছেন!"

অর্থাৎ রিজাইন লেটার যেন পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই হারিয়ে গেল।

আমি চুপচাপ নিজের কাজ করছিলাম।

এমন সময় ফাহাদ ভাই এসে বললেন,

— "দেখো দিগন্ত, কোনো ডকুমেন্ট যদি জমা পড়ে, তার একটা গন্তব্য থাকে। পদার্থবিজ্ঞানে যেমন শক্তির সংরক্ষণ সূত্র আছে, অফিসে আছে ফাইলের গমন সূত্র। ফাইল চিরকাল ড্রয়ারে থাকতে পারে না!"

আমি শুধু মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম।

পাশে বসে থাকা জাহেদ ভাই ধীরে ধীরে বললেন,

— "সময় হলে ঠিক বের হবে।"

এটাই ছিল জাহেদ ভাইয়ের স্বভাব— কম কথা, কিন্তু ওজনদার কথা।

এর মধ্যেই ইমতিয়াজ ভাই অফিসে ঢুকলেন।

তিনি বললেন,

— "কোম্পানির লাইসেন্সের ফাইল যেমন শেষ পর্যন্ত সঠিক টেবিলে পৌঁছায় বা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি, রিজাইন লেটারও পৌঁছাবে। এটা প্রশাসনিক মহাবিশ্বের নিয়ম!"

সবাইতো হেসে খুন।

ঠিক সে মুহূর্তে শিহাব ভাই অফিসে আসলেন।

মুখে সেই চিরচেনা হাসি।

তিনি বললেন,

— "মনে হচ্ছে আমার রিজাইন লেটারও ওকালতি শিখে ফেলেছে। মামলার তারিখ পড়ে আছে, কিন্তু শুনানি হচ্ছে না!"

তারপর একটু থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,

— "ঠিক আছে... এবার আপিল নয়, সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট!"

সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

শিহাব ভাই কম্পিউটারের সামনে বসলেন।

ইমন ভাই, আমাদের সবার ছোট কিন্তু কাজে খুবই দক্ষ, সে নরম গলায় বলল,

— "শিহাব ভাই, ই-মেইল ওপেন করে দিচ্ছি?"

— "দেনতো ইমন ভাই, আজ প্রযুক্তির বিচার হবে!"

কয়েক মিনিট পর...

টিং!

একটা ই-মেইল।

তারপর আরেকটা।

তারপর আরেকটা।

রিজাইন লেটার এবার শুধু একজনের কাছে নয়— মুকুল স্যারসহ সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ইনবক্সে!

শিহাব ভাই চেয়ারে হেলান দিয়ে বিখ্যাত সংলাপটি বললেন,

— "দেখি এবার কিভাবে রিজাইন লেটার অ্যাকসেপ্ট না করে!"

অফিসে এমন হাসির রোল উঠল যে পাশের বিভাগের লোকজনও উঁকি দিল।

এদিকে রুদ্র ভাই খবরের গন্ধ পেয়ে বললেন,

— "এই ঘটনা যদি মিডিয়ায় যেত, শিরোনাম হতো— 'ড্রয়ারকে হারিয়ে দিল ই-মেইল!'"

সবাই আবার হেসে উঠল।

ঠিক তখন মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার অফিসে ঢুকলেন।

তিনি সব শুনে নিজের স্বভাবসুলভ মজার ভঙ্গিতে বললেন,

— "আরে ভাই, এ তো দেখি রিজাইন না, নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মতো অবস্থা! চল আগে সবাই খাই, তারপর রিজাইন নিয়া আলোচনা হবে!"

এদিকে কালাম ভাই চা এনে বললেন,

— "স্যার, আজকে চা একটু বেশি মিষ্টি করেছি।"

সেলিম ভাই সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,

— "আজকে অফিসে মন খারাপের খবর, তাই চায়ে বাড়তি চিনি মিশাইছি!"

আবারও হাসির ঝড়।

সবশেষে মুকুল স্যার নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত কণ্ঠে বললেন,

— "শিহাব, তোমাকে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের পথচলা থামিয়ে রাখা যায় না।"

শিহাব ভাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

— "স্যার, রিজাইন করেছি চাকরি থেকে, সম্পর্ক থেকে না।"

কথাটা শুনে পুরো রুম কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল।

আমি, দিগন্ত কুমার রায়, সবকিছু নীরবে দেখছিলাম।

মনে মনে লিখে ফেললাম—

"একটা রিজাইন লেটার হয়তো অফিস ছাড়ার কাগজ হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সহকর্মীদের আন্তরিক সম্পর্কের কোনো রিজাইন লেটার কখনো লেখা যায় না। ড্রয়ারে কাগজ আটকে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা কিংবা ই-মেইলের 'সেন্ড' বাটন— কোনোটাকেই চিরদিন আটকে রাখা যায় না!"

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

 

Sunday, July 12, 2026

বৃষ্টির দিনে ছাতার রহস্য !

 

বৃষ্টির দিনে ছাতার রহস্য

১২ জুলাই ২০২৬। আকাশের মেঘ মশাই সকাল থেকেই যেন আকাশের সব জল একসঙ্গে ঢেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অঝোরধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক—সব জায়গায় হাঁটুসমান পানি। অফিসে আসতে যারা পেরেছেন, তাদের মুখে একটাই কথা—"আজ বাসায় ফিরবো কীভাবে?"

আমি, দিগন্ত কুমার রায়, জুনিরয়র এইচ.আর. অফিসার হিসেবে, আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস, মগবাজার, ঢাকায় কর্মরত। প্রতিদিনের মতো সময়মতো অফিসে উপস্থিত হয়েছিলাম। মানবসম্পদ বিভাগ সম্পর্কিত দৈনিক কাজগুলো গুছিয়ে শেষ করছিলাম। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে.....

দুপুর একটা বাজতেই জাহেদ ভাই-এর মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

—"হ্যালো... আচ্ছা, আসছি।"

ফোন রেখে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—"
ভাই, বাসায় যাচ্ছেন?"

তিনি হালকা হাসলেন,
—"
ভাবি অপেক্ষা করছে। বলেছে, গরম ভাত আর ইলিশ ভাজা ঠান্ডা হওয়ার আগেই যেন পৌঁছে যাই।"

আমি বললাম,
—"
তাহলে আর দেরি কেন?"

জাহেদ ভাই চেয়ার থেকে উঠে নিজের ছাতার দিকে হাত বাড়ালেন...

তারপরই শুরু হলো আসল নাটক।

ছাতা নেই!

ড্রয়ার খুললেন।

আলমারি দেখলেন।

টেবিলের নিচে তাকালেন।

রিসেপশন পর্যন্ত খোঁজ নিলেন।

ছাতার কোনো হদিস নেই।

এদিকে ফোনের পর ফোন।

—"আপনি কোথায়?"

—"ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!"

—"বৃষ্টি তো থামছেই না!"

জাহেদ ভাইয়ের মুখের শান্ত ভাবটাও ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেল।

ঠিক তখনই পাবলিক রিলেশন অফিসার রুদ্র ভাই এসে বললেন,

—"কোনো সমস্যা?"

আমি ঘটনা বলতেই তিনি যেন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

—ছাতা উদ্ধার অভিযানে নামতে হবে! আমি মিডিয়ার মানুষ, তথ্য সংগ্রহ আমার পেশা।"

বলেই তিনি পুরো অফিসে ঘোষণা দিয়ে বললেন,

—"যার কাছে কোনো সবুজ ছাতা দেখা যাবে, সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করবেন!"

অফিসে হাসির রোল পড়ে গেল।

এদিকে অফিস সহকারী সেলিম ভাই এক কাপ গরম চা এনে বললেন,

—"স্যার, ছাতা পরে পাওয়া যাবে। আগে চা খান। বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে শক্তি লাগে।"

জাহেদ ভাই মৃদু হেসে বললেন,

—"চা দিয়ে যদি ছাতা জন্মাত, তাহলে এখনই খেতাম!"

আমি চুপচাপ পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, একটি ছাতা কীভাবে পুরো অফিসকে একসঙ্গে ব্যস্ত করে তুলতে পারে!

প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল।

হঠাৎ পাশের রুমের দরজা খুলে একজন ভদ্রলোক ভিজে অবস্থায় ঢুকলেন।

হাতে একটি পরিচিত সবুজ ছাতা

তিনি আল-আমিন হোসেন, অফিসার, আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি লিমিটেড।

হাসতে হাসতে বললেন,

—"আরে! এই ছাতাটা কি আপনাদের? আমি বের হওয়ার সময় নিজেরটা ভেবে নিয়ে গিয়েছিলাম।"

এক মুহূর্ত নীরবতা...

তারপর পুরো অফিস একসঙ্গে হেসে উঠল।

জাহেদ ভাই ছাতাটা হাতে নিয়ে বললেন,

—"আজ বুঝলাম, ছাতারও অফিস ট্যুর থাকে!"

রুদ্র ভাই সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,

—"আজকের সংবাদ শিরোনাম—'একটি ছাতার আন্তঃপ্রতিষ্ঠানিক সফর সফলভাবে সমাপ্ত!'"

সেলিম ভাই হেসে বললেন,

—"স্যার, ছাতারও মনে হয় বৃষ্টিতে একটু ঘুরে আসতে ইচ্ছা করেছিল!"

আমি মৃদু হেসে বললাম,

—"শেষ পর্যন্ত সবাইকে একসঙ্গে হাসানোর দায়িত্বটা ছাতাই পালন করল।"

অবশেষে জাহেদ ভাই ছাতা নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। ঢাকা শহরের রাস্তায় হাঁটু পানি, যানজট, ভোগান্তি—সব আগের মতো। কিন্তু আমাদের অফিসে সেই দিনের সবচেয়ে বড় খবর ছিল না বৃষ্টি, না জলাবদ্ধতা।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল—

"একটি ছাতা নিখোঁজ এবং ফিরে পাওয়ার ঘটনা"

আর আমি, দিগন্ত কুমার রায়, সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম—অফিসে দায়িত্বশীল মানুষ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এমন কিছু ছোট্ট ঘটনা, যা ব্যস্ত দিনের মাঝেও সবাইকে একসঙ্গে প্রাণ খুলে হাসতে শেখায়।

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com