সময় এবং তারিখ

ঢাকা,বাংলাদেশ 

Thursday, July 9, 2026

বিয়ে মিস, ভোজে হিট !

 বিয়ে মিস, ভোজে হিট!


কর্পোরেট অফিসে চাকরি করতে এসে একটা জিনিস খুব ভালোভাবে শিখেছি—অফিসে মিটিং যত গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ “খাওয়ার মিটিং”! আমি দিগন্ত কুমার রায়, জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

আমার ইমিডিয়েট বস ফাহাদ ভাইয়ের বিয়ে। বাসা সরিষাবাড়ি, জামালপুর। অফিসের সবাইকে আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

কয়েকদিন পর ফাহাদ ভাই অফিসে ফিরলেন। নতুন বরের সেই আলাদা উজ্জ্বলতা যেন পুরো ফ্লোরটাই আলোকিত করে দিল। অফিসে এসেই তিনি স্টেট-ফরওয়ার্ড ঘোষণা দিলেন,

আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবাবী ভোজ-এ বিয়ের খাওয়া হবে। কেউ অজুহাত দিলে এইচ.আর. ফাইলে নোট হয়ে যাবে!”

আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। মনে মনে ভাবলাম, “অজুহাত দেওয়ার সাহস কার!”

দাওয়াতের দিন সবাই যেন অফিসের নির্ধারিত কাজ তারাতারি শেষ করার অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নেমে গেল। আমি যথারীতি দায়িত্বের কাজগুলো সুন্দরভাবে শেষ করে বের হলাম।

রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই ফাহাদ ভাই বললেন,

—“আজ কোনো সিনিয়র-জুনিয়র নেই। সবাই সমান। তবে বিল দেওয়ার সময় কেউ সমান হওয়ার চেষ্টা করবেন না!”

এই একটা বাক্যেই পুরো টেবিল হেসে উঠল।

জাহেদ ভাই যথারীতি শান্ত স্বভাবের মানুষ। মেন্যুকার্ড হাতে নিয়ে এমনভাবে দেখছেন যেন কোম্পানির নতুন এইচ.আর. পলিসি যাচাই করছেন।

আমি মজা করে বললাম,

—“ভাই, খাবার অডিট করছেন নাকি?”

তিনি মুচকি হেসে বললেন,

—“ভুল অর্ডার দিলে পরে আফসোস করতে হবে।”

এমন সময় শিহাব ভাই বললেন,

—“খাবার শুরু করার আগে ঘোষণা করছি—যে যার প্লেটের খাবার শেষ করবেন। পরে কেউ যদি বলে ‘আরেকটু বিরিয়ানি চাই’, সেটা হবে পুনর্বিবেচনার আবেদন। তবে সিদ্ধান্ত হবে রেস্টুরেন্টের আদালতে!”

আমরা সবাই হেসে কুটিকুটি।

তিনি আবার বললেন,

—“আর যদি কেউ অন্যের বিরিয়ানিতে হাত দেন, তাহলে সেটা হবে ‘দখল মামলা’। আমি কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবী হতে রাজি আছি!”

রেস্টুরেন্টের পাশের টেবিলের মানুষও আমাদের হাসি দেখে তাকিয়ে রইল।

এদিকে ইমতিয়াজ ভাই বললেন,

—“যা ভালো আছে, সবকিছু আনেন। আজকে কারও প্লেটে যেন খালি জায়গা না থাকে।”

ওয়েটার একবার আমাদের দিকে, একবার তাঁর দিকে তাকাল। মনে হলো, এই টেবিলটাই আজ রেস্টুরেন্টের ভিআইপি টেবিল।

খাবার আসতে শুরু করল। কাচ্চি, বোরহানি, সালাদ, পানীয়—টেবিল ধীরে ধীরে এমন রূপ নিল যে মোবাইল বের করে ছবি না তুলে থাকা কঠিন।

ঠিক তখনই মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার ঢুকলেন।

তিনি স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বললেন,

—“আরে, তোরা তো দেখি আমারে না ডাইকা ভোজ শুরু কইরা দিছস! এইডা কিন্তু মাইন্ন্যা লওয়া যায় না!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

তিনি চেয়ারে বসেই বললেন,

—“ওই ওয়েটার ভাই, প্লেটটা একটু বড় দেন। ছোট প্লেটে আমার মন ভরে না!”

তারপর তাঁর সেই পরিচিত মজার কথাবার্তায় পুরো পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

এদিকে রুদ্র ভাই মোবাইল বের করে বললেন,

—“একটা গ্রুপ ছবি হবে। তবে কেউ যেন এমন ভাব না নেয় যে কালকের পত্রিকায় ‘নবাবী ভোজে মানবসম্পদ বিভাগের খাদ্য সমাহার’ শিরোনাম হবে!”

আবারও হাসির রোল।

অফিসের অন্যান্য সহকর্মীরাও কম যান না।

একজন বললেন,

—“আজকে যে যত বেশি খাবে, কাল অফিসে সে তত কম কাজ করবে।”

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন,

—“না ভাই, এত খাওয়ার পরে চেয়ার থেকেই উঠতে পারব কি না, সেটাই আগে দেখা দরকার।”

এদিকে ফাহাদ ভাই সবার প্লেট লক্ষ্য করছেন।

আমার প্লেটে বিরিয়ানি একটু কম দেখে বললেন,

—“দিগন্ত, এইচ.আর.-এ কাজ করেন বলে কি খাবারেও নিয়মনীতি? আরেকটু নেন।”

আমি বললাম,

—“ভাই, পরে ডেজার্টের জন্য জায়গা রাখতে হবে।”

সবাইতো হেসে মশগুল।

শেষে এল পানীয় (কোকাকোলা)।

আমরা ভেবেছিলাম অনুষ্ঠান শেষ।

কিন্তু না।

ফাহাদ ভাই আবার ঘোষণা দিলেন,

—“আজকে যে সবচেয়ে বেশি খেয়েছে, সে আগামী এক সপ্তাহ অফিসে ক্ষুধার কথা বলতে পারবে না!”

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“আমি আপত্তি জানাচ্ছি। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব!”

সুমন স্যার সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“আদালতে যাওনের আগে আরেক প্লেট কাচ্চি খাইয়া যাও!”

রেস্টুরেন্ট আবারও হাসিতে মুখর হয়ে উঠল।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু পেট ভরে খাইনি; স্মৃতির ঝুলিও ভরে নিয়েছি।

কারণ হলো—কর্পোরেট জীবনে কিছু মিটিং মিনিটসে লেখা থাকে, আর কিছু মিটিং লেখা থাকে মানুষের মনে। ফাহাদ ভাইয়ের বিয়ের পরের এই নবাবী ভোজ ছিল ঠিক তেমনই।

 

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

No comments:

Post a Comment