সময় এবং তারিখ

ঢাকা,বাংলাদেশ 

Wednesday, July 8, 2026

প্রমোশনের বুফে !

প্রমোশনের বুফে !


২০২৩ সালের একটি প্রমোশন পরবর্তী ঘটনা ।

অফিসে ঢুকেই শুনলাম চারদিকে একটাই আলোচনা—“আজকে কিন্তু বড় খবর!”

আমি, দিগন্ত কুমার রায়, যথারীতি চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছি । আমার নীতি একটাই—কম কথা, বেশি কাজ । অফিসের নিয়ম মেনে চলি, আর দায়িত্ব পেলে সেটাকে নিজের কাজ মনে করেই করি ।

হঠাৎ আমার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন ফাহাদ ভাই।

“দিগন্ত, খবর জানেন?”

আমি মাথা নাড়লাম । না ভাই !

তিনি বললেন—

“দেখেন, প্রতিষ্ঠানে যখন যোগ্য লোকের প্রমোশন হয়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, প্রতিষ্ঠানেরও অর্জন । আর এই অর্জনের সামাজিক উদযাপন হওয়া উচিত । তাই আজকে কোনো অজুহাত চলবে না । খাওয়া দিতে হবে ।”

ফাহাদ ভাই একবার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তাঁকে আর বদলানো কঠিন । কারণ তিনি সচরাচর ভেবেচিন্তে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকেন, প্রামাণিত । তাঁর কথায় এমন যুক্তি থাকে যে শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি হয়ে যায় । অধীনস্তদের জন্য তিনি যেন সত্যিই এক বিশাল বটগাছের ছায়া ।

ঠিক তখনই অফিসে ঢুকলেন নতুন প্রমোশন পাওয়া চার নায়ক—ফয়েজ ভাই, রুদ্র ভাই, ইমতিয়াজ ভাই এবং শিহাব ভাই ।

রুদ্র ভাই এসেই সবার সঙ্গে এমনভাবে কুশল বিনিময় শুরু করলেন যেন অফিস নয়, বহুদিন পর আত্মীয়দের ঈদের মিলনমেলা ।

ইমতিয়াজ ভাই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললেন,

“আজকে কেউ বিল নিয়ে চিন্তা করবেন না । আজ আনন্দের দিন ।”

আমি মনে মনে ভাবলাম, “বিলের কথা তো কেউ এখনো বলেনি। কিসের বিল?”

এরই মধ্যে শিহাব ভাই ঘোষণা দিলেন—

“আজ সন্ধ্যায় সবাই গ্রীন লাউঞ্জ, বেইলী রোড । বুফে পার্টি।”

সারা অফিসে যেন আনন্দের ঢেউ ।

এমন সময় এইচ.আর.এম এন্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যার কক্ষে প্রবেশ করলেন ।

তিনি হাসিমুখে বললেন,

“তোমাদের আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগছে । তবে একটা কথা মনে রেখো—খাবারের চেয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের মূল্য অনেক বেশি ।”

স্যারের কথায় এমন আন্তরিকতা ছিল- সবাই হাততালি দিয়ে উঠল ।

দুপুরের দিকে আমি নতুন যোগদানকৃত স্টাফদের ফাইল দেখছি ।

ঠিক তখনই সহকারী পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার প্রবেশ করলেন।

তিনি রুমে প্রবেশ করেই বললেন,

“কিরে দিগন্ত! এত সিরিয়াস মুখ কেন? মনে হচ্ছে বুফের আগে ডায়েট শুরু করে দিয়েছিস নাকি?”

তারপর নিজের স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি মেশানো ভাষায় সবাইকে হাসাতে লাগলেন । তাঁর সেই মজার কথাগুলো এতটাই প্রাণবন্ত ছিল যে পুরো বিভাগে হাসির রোল পড়ে গেল ।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ।

সবাই পৌঁছে গেলাম গ্রীন লাউঞ্জে ।

ফয়েজ ভাই যেন পুরো অনুষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজার ।

কে কোথায় বসবে, কে আগে খাবার নেবে, কে ছবি তুলবে—সব তাঁর নখদর্পণে।

আমি চুপচাপ এক কোণে বসে ছিলাম ।

ফয়েজ ভাই এসে বললেন,

“দাদা, আজকে আপনার দায়িত্ব—খাবারের আগে সবাই আছে কি না সেটা নিশ্চিত করবেন ।”

আমি দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিতি মিলিয়ে ফেললাম ।

ফাহাদ ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“দেখছেন? এই জন্যই দায়িত্ববান লোকের আলাদা মূল্য আছে ।”

ঠিক তখনই শিহাব ভাই শুরু করলেন তাঁর হাস্যরসাত্মক কথা-

তিনি বললেন,

—“বুফেতে একটা নিয়ম করা উচিত—যে সবচেয়ে বেশি ডেজার্ট খাবে, সে পরের প্রমোশনের আগে ডায়েট চার্ট জমা দেবে!”

পুরো অফিস হেসে উঠল ।

তারপর তিনি আরও যোগ করলেন,

“বুফেতে তিন ধরনের মানুষ থাকে ।

এক নম্বর—যারা খাবার দেখে ।

দুই নম্বর—যারা ছবি তোলে ।

তিন নম্বর—যারা প্রথম দুইজনের অপেক্ষায় থেকে শেষে প্লেট ভর্তি করে!”

রুদ্র ভাই বললেন,

“আমি তো তিন নম্বর দলের আজীবন সদস্য!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল ।

 

ইমতিয়াজ ভাই বললেন,

“আজকে প্লেট ছোট হলে রিফিল হবে, কিন্তু আনন্দ ছোট হলে রিফিল হবে না ।”

এমন সময় জলিল স্যার ধীরে ধীরে বললেন,

“তোমরা এত হাসছো, হিসাবের খাতা কিন্তু হাসে না।”

সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ ।

তারপর তিনি নিজেই মুচকি হেসে বললেন,

“ভাগ্য ভালো, আজ বিল তোমাদের না!”

আবার হাসির বিস্ফোরণ ।

খাওয়া শুরু হলো ।

কেউ কাবাব নিচ্ছে, কেউ বিরিয়ানি, কেউ স্যুপ, কেউ ডেজার্ট, যার যা ইচ্চ্ছা খাচ্ছে ।

আমি অল্প অল্প করে সবকিছু নিচ্ছিলাম ।

সুমন স্যার টেবিলের ওপার থেকে চিৎকার করে বললেন,

“এই দিগন্ত! এত কম খাবি? অফিসে তোকে দেখে মনে হয় সারা মাস নিরামিশ খাস, আজ একটু তেলের তৈরি খাবার খা! খেলে মরবি না;  না হয় দুইদিন কম বাঁচলি!”

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,

“ওনাকে বেশি খেতে দিয়েন না । কাল অফিসে এসে যদি বলে ‘বুফে নীতিমালা’ বানাতে হবে, তাহলে কিন্তু শেষ!”

হাসতে হাসতে আমারও চোখে পানি এসে গেল ।

খাওয়ার শেষে ছবি তোলার পালা ।

রুদ্র ভাই সবাইকে এমনভাবে দাঁড় করালেন যেন জাতীয় পুরস্কার গ্রহণের ছবি তোলা হচ্ছে ।

ফয়েজ ভাই বললেন,

“এখন সবাইকে একটু ভদ্রভাবে হাসতে হবে!”

ঠিক তখনই শিহাব ভাই বললেন,

“যারা দ্বিতীয়বার আইসক্রিম খেয়েছেন, তারা একটু বেশি হাসুন!”

আবারও অট্টহাসি।

শেষে মুকুল স্যার সবাইকে দেখে বললেন,

“আজকের সবচেয়ে বড় অর্জন যারা প্রমোশন পেয়েছে, তাদের দেওয়া এই সুন্দর আনন্দঘন মুহূর্ত”

আমি নীরবে চারপাশে তাকালাম ।

ভাবলাম—

পদবি মানুষকে বড় করে না ।

একসঙ্গে হাসতে পারা, একে অপরকে সম্মান করা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবই একটি অফিসকে পরিবারে পরিণত করে ।

সেদিন গ্রীন লাউঞ্জের বুফে শেষ হয়েছিল ।

কিন্তু সেই সন্ধ্যার হাসি, কৌতুক, সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতির স্বাদ আজও যেন মনের প্লেটে গরম গরম পরিবেশন হয় ।

 

সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com

No comments:

Post a Comment