রিজাইন লেটারের মহাযুদ্ধ
আমি দিগন্ত কুমার রায়, সাধারণত
খুব কম কথা বলি। সবাই বলে, "দিগন্ত ভাই কথা কম বলেন" । নিয়ম মেনে কাজ করা, দায়িত্ব ঠিকভাবে
পালন করার সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করা, আর কোম্পানির নীতিমালা অনুসরণ করাই আমার অভ্যাস।
তাই অফিসে কোনো ঘটনা ঘটলে আমি চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করি, তারপর মনে মনে ভাবি— "এটা নিয়ে একদিন কিছু লেখা
যায় কিনা !"
সেদিন সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই।
হঠাৎ অফিসে গুঞ্জন উঠল— শিহাব ভাই
নাকি চাকরি থেকে রিজাইন করেছেন!
(বলে রাখা ভালো। আমি প্রথম ওনার রিজাইনের
বিষয়টি ফেসবুক পোস্ট থেকে দেখেছি।)
আমি অবাক! কারণ শিহাব ভাই মানেই অফিসের হাসির ফোয়ারা। লিগ্যালের মানুষ হয়েও এমনসব
জোকস বলতেন যে, আদালতের বিচারকও শুনলে হয়তো বলতেন, "আগে একটু হেসে নিই, তারপর
রায় দেব!"
একদিন তিনি মজা করে বলেছিলেন,
—
"আইনজীবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন? বাসায় বউ যদি বলে, 'আপনি ভুল করেছেন',
তখনও মনে হয়— Objection,
Your Honor "
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়েছিল।
কিন্তু, আর যাই হোক খবরটা সত্যি ছিল।
পরে জানা গেল, শিহাব ভাই প্রথমে নিজের
পদত্যাগপত্র মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যার-এর হাতে দিয়েছিলেন।
মুকুল স্যার আমাদের অভিভাবক। এতটাই
নরম স্বভাবের যে, কেউ ছুটি চাইলে আগে জিজ্ঞেস করেন,
— "কোনো
সমস্যা হয়েছে নাকি?"
তিনি শিহাব ভাইকে এতটাই স্নেহ করতেন
যে, রিজাইন লেটার দেখে বলেছিলেন,
—
"আচ্ছা... এটা একটু পরে দেখি।"
"পরে দেখা" বলতে কী বুঝিয়েছিলেন,
সেটা পরে সবাই বুঝল।
কেউ বলল, চিঠিটা টেবিলের ড্রয়ারে।
কেউ বলল, বাসার আলমারিতে।
কেউ আবার বলল,
— "স্যার
সম্ভবত এটাকে সরকারি গোপন নথির মতো সংরক্ষণ করেছেন!"
অর্থাৎ রিজাইন লেটার যেন পৃথিবীর মানচিত্র
থেকেই হারিয়ে গেল।
আমি চুপচাপ নিজের কাজ করছিলাম।
এমন সময় ফাহাদ ভাই এসে বললেন,
— "দেখো
দিগন্ত, কোনো ডকুমেন্ট যদি জমা পড়ে, তার একটা গন্তব্য থাকে। পদার্থবিজ্ঞানে যেমন
শক্তির সংরক্ষণ সূত্র আছে, অফিসে আছে ফাইলের গমন সূত্র। ফাইল চিরকাল ড্রয়ারে থাকতে
পারে না!"
আমি শুধু মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম।
পাশে বসে থাকা জাহেদ ভাই ধীরে
ধীরে বললেন,
— "সময়
হলে ঠিক বের হবে।"
এটাই ছিল জাহেদ ভাইয়ের স্বভাব— কম কথা, কিন্তু ওজনদার কথা।
এর মধ্যেই ইমতিয়াজ ভাই অফিসে
ঢুকলেন।
তিনি বললেন,
— "কোম্পানির
লাইসেন্সের ফাইল যেমন শেষ পর্যন্ত সঠিক টেবিলে পৌঁছায় বা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি,
রিজাইন লেটারও পৌঁছাবে। এটা প্রশাসনিক মহাবিশ্বের নিয়ম!"
সবাইতো হেসে খুন।
ঠিক সে মুহূর্তে শিহাব ভাই অফিসে আসলেন।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
তিনি বললেন,
— "মনে
হচ্ছে আমার রিজাইন লেটারও ওকালতি শিখে ফেলেছে। মামলার তারিখ পড়ে আছে, কিন্তু
শুনানি হচ্ছে না!"
তারপর একটু থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে
বললেন,
— "ঠিক
আছে... এবার আপিল নয়, সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট!"
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শিহাব
ভাই কম্পিউটারের সামনে বসলেন।
ইমন ভাই,
আমাদের সবার ছোট কিন্তু কাজে খুবই দক্ষ, সে নরম গলায় বলল,
— "শিহাব
ভাই, ই-মেইল ওপেন করে দিচ্ছি?"
— "দেনতো ইমন ভাই, আজ প্রযুক্তির বিচার হবে!"
কয়েক মিনিট পর...
টিং!
একটা ই-মেইল।
তারপর আরেকটা।
তারপর আরেকটা।
রিজাইন লেটার এবার শুধু একজনের কাছে
নয়— মুকুল স্যারসহ সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার
ইনবক্সে!
শিহাব
ভাই চেয়ারে হেলান দিয়ে বিখ্যাত সংলাপটি বললেন,
— "দেখি
এবার কিভাবে রিজাইন লেটার অ্যাকসেপ্ট না করে!"
অফিসে এমন হাসির রোল উঠল যে পাশের
বিভাগের লোকজনও উঁকি দিল।
এদিকে রুদ্র ভাই খবরের গন্ধ
পেয়ে বললেন,
— "এই
ঘটনা যদি মিডিয়ায় যেত, শিরোনাম হতো—
'ড্রয়ারকে হারিয়ে দিল ই-মেইল!'"
সবাই আবার হেসে উঠল।
ঠিক তখন মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার অফিসে ঢুকলেন।
তিনি সব শুনে নিজের স্বভাবসুলভ মজার
ভঙ্গিতে বললেন,
— "আরে
ভাই, এ তো দেখি রিজাইন না, নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মতো অবস্থা! চল
আগে সবাই খাই, তারপর রিজাইন নিয়া আলোচনা হবে!"
এদিকে কালাম ভাই চা এনে বললেন,
— "স্যার,
আজকে চা একটু বেশি মিষ্টি করেছি।"
সেলিম ভাই
সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,
— "আজকে
অফিসে মন খারাপের খবর, তাই চায়ে বাড়তি চিনি মিশাইছি!"
আবারও হাসির ঝড়।
সবশেষে মুকুল স্যার নিজের স্বভাবসুলভ
শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "শিহাব,
তোমাকে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের পথচলা থামিয়ে রাখা যায় না।"
শিহাব
ভাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
— "স্যার,
রিজাইন করেছি চাকরি থেকে, সম্পর্ক থেকে না।"
কথাটা শুনে পুরো রুম কয়েক সেকেন্ডের
জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল।
আমি, দিগন্ত কুমার রায়, সবকিছু
নীরবে দেখছিলাম।
মনে মনে লিখে ফেললাম—
"একটা
রিজাইন লেটার হয়তো অফিস ছাড়ার কাগজ হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর
সহকর্মীদের আন্তরিক সম্পর্কের কোনো রিজাইন লেটার কখনো লেখা যায় না। ড্রয়ারে কাগজ
আটকে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা কিংবা ই-মেইলের 'সেন্ড' বাটন— কোনোটাকেই চিরদিন আটকে রাখা যায় না!"
সৌজন্যে-
দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস
২ বড় মগবাজার,
ঢাকা-১২১৭ ।
মোবাইল:
01717-113087
ইমেইল: digantaroy295@gmail.com