সময় এবং তারিখ

ঢাকা,বাংলাদেশ 

Tuesday, July 7, 2026

কর্পোরেট অফিসে একদিন

কর্পোরেট অফিসে একদিন

 

সেদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল । আমি সফটঅয়্যারে কর্মীদের তথ্য আপডেট করে চিঠি-পত্র রেডি করছি স্বাক্ষরের জন্য । ঠিক তখনই ফাহাদ ভাই দ্রুত হেঁটে এসে বললেন,

— “দিগন্ত, আজ সকল চিঠি-পত্র স্বাক্ষর করাতে হবে, তারাতারি রেডি করেন । কিন্তু, একটা মজার ঘটনা ঘটেছে!”

আমি মাথা তুলে শুধু বললাম, — “কি ভাই?”

ফাহাদ ভাই বললেন, — “কেউ একজন পুরো অফিসে ‘Reply All’ দিয়ে লিখেছে— ‘যে ফ্রিজ থেকে আমার দই খেয়েছেন, তিনি দয়া করে অন্তত চামচটা ধুয়ে রাখবেন!’”

পুরো অফিসে তখন হাসির রোল।

ফাহাদ ভাই অবশ্য হাসির মধ্যে বললেন -

— “দইয়ের মূল্য দশ টাকা না একশ টাকা সেটা বিষয় না । বিষয় হলো ন্যায়বিচার । যার দই, তার দই । আর যার চামচ, তার চামচ!”

তার যুক্তির সামনে কেউ আর তর্ক করল না ।

এদিকে জাহেদ ভাই চুপচাপ বসে পুরো ই-মেইল থ্রেড বিশ্লেষণ করছেন । তিনি সবসময় পরিস্থিতি বুঝে কথা বলেন । কয়েক মিনিট পর শান্তভাবে বললেন,

— “ভাই, Reply All করেছে ভুলে । আসল উদ্দেশ্য ছিল একজনকে পাঠানো ।”

সবাই একসাথে বলল, — “আহা!”

ঠিক তখনই লিগ্যাল অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের শিহাব ভাই ঢুকলেন ।

তিনি পরিস্থিতি বুঝে বললেন,

— “আইন অনুযায়ী দইয়ের মালিকানা প্রমাণ করতে হলে প্রথমে ফ্রিজে থাকা দইয়ের সাক্ষী লাগবে!”

হাসির শব্দ থামার আগেই তিনি আবার বললেন,

— “যদি দই নিজে সাক্ষ্য দিতে পারত, তাহলে কোর্টে প্রথম প্রশ্ন হতো— ‘আপনি কি নিজ ইচ্ছায় খাওয়া হয়েছেন?’”

এবার এমন হাসি শুরু হলো যে পাশের বিভাগের লোকজনও উঁকি দিতে লাগল ।

আমি (দিগন্ত) হাসলেও রিপোর্ট ঠিকঠাক সাজিয়ে যাচ্ছিলাম।

দুপুরে পরিচালক (মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল) স্যারের কক্ষে সবাই উপস্থিত হলাম।

স্যার সবার কথা মন দিয়ে শুনলেন । তাঁর স্বভাবই এমন—নরম, ধৈর্যশীল ।

সব শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন,

— “একটা দইয়ের কারণে যদি সবাই একসাথে হাসতে পারে, তাহলে এটাও কর্পোরেট কালচারের অংশ । তবে পরেরবার নাম না লিখে ‘Reply All’ নয়।”

 সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল ।

ঠিক তখনই ইমতিয়াজ ভাই দরজা খুলে ঢুকলেন ।

গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,

— “সব লাইসেন্সের কাজ শেষ । আর দই যদি অফিসের সম্পদ হয়ে থাকে, তাহলে তারও একটা রেজিস্টার রাখা উচিত!”

কথাটা এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন যে কয়েক সেকেন্ড কেউ বুঝতেই পারল না তিনি মজা করছেন নাকি সত্যি ।

এরপর তিনিই বললেন,

— “চলো, আজ সবাইকে কফি খাওয়াই”

সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাততালি দিল ।

ঠিক তখন সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার অফিসে এসেই বললেন,

— “আরে এই যে! তোমরা দই নিয়ে মিটিং করছ? এইসব দুষ্টু লোকজনের জন্যই অফিসে ফ্রিজে তালা লাগাতে হয়!”

তারপর নিজের স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে কয়েকটি হালকা মজার আঞ্চলিক গালি ব্যবহার করলেন, যেগুলো শুনে কেউ অপমানিত হলো না; বরং পুরো রুম আবার হাসিতে ভরে গেল ।

তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন,

— “শুধু কফি ক্যা? আমার অফিসে চল । বিরিয়ানি, কাবাব, ডিম, মৌসুমী ফল, চা, কী খাবি—সব ব্যবস্থা আছে। খালি পেটে অফিসের নীতি শেখা যায় নাকি!”

আর ঠিক তখনই অফিস সহকারী কালাম ভাই ট্রে ভর্তি চা/কফি ও বিস্কুট নিয়ে রুমে ঢুকলেন। তিনি পরিচালক থেকে শুরু করে জুনিয়র স্টাফ—সবার সামনে সমান আন্তরিকতায় চা-কফি পরিবেশন করলেন।

হাসিমুখে বললেন,

— "স্যার, আগে এক কাপ চা হয়ে যাক। খালি পেটে মিটিং করলে সিদ্ধান্তও শুকনো হয়ে যায়!"

শিহাব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,

— "কালাম ভাই, আপনার চা না থাকলে আমাদের মিটিংয়ের মিনিটসও ঘুমিয়ে পড়ত!"

হাসির রোল পড়ে গেল পুরো রুমে।

ফাহাদ ভাই মুচকি হেসে বললেন,

— "দেখো দিগন্ত, কর্পোরেট অফিসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ মানুষ হলো কালাম । তিনি পদবি দেখেন না; সবার জন্য একই হাসি, একই চা, একই বিস্কিট ।"

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম । সত্যিই, কালাম ভাই প্রতিদিন নীরবে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন । চা-কফি পরিবেশন থেকে শুরু করে অফিসের অন্যান্য কাজ—সব কিছুই করেন হাসিমুখে ।

 

এমন সময় সেলিম ভাই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন,

— "স্যার, ওয়াসরুমগুলো পরিষ্কার করে দিলাম । আর পাশের কনফারেন্স রুমেও চা দিয়ে আসলাম।"

শিহাব ভাই এবার বললেন-।

— "সেলিম ভাই, আপনার কারণে আমাদের অফিসের ওয়াসরুমে ঢুকলেও মনে হয় ফাইভ স্টার হোটেলে এসেছি!"

সবাই হেসে উঠল ।

সেলিম ভাই লাজুক হেসে বললেন,

— "স্যার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে সবাই ভালোভাবে কাজ করতে পারে । এটাই আমার আনন্দ।"

ইমতিয়াজ ভাই গম্ভীর মুখে বললেন,

— "একটা প্রতিষ্ঠানের মান শুধু কনফারেন্স রুম দেখে বোঝা যায় না; ওয়াসরুম দেখেও বোঝা যায় । সেলিম ভাই তার দায়িত্ব খুব ভালোভাবে পালন করছে।"

এদিকে রুদ্র ভাই ইতিমধ্যে সকল টিভি চ্যানেল, প্রিন্ট মিডিয়া, ফেসবুক ও ইউটিউবার—সবার সঙ্গে কথা বলেছেন ।

তিনি বললেন,

— “আমি খবর নিয়ে এসেছি। দইয়ের ঘটনা এখন পুরো অফিসের আলোচনার বিষয় ।

সবাই হাততালি দিল ।

ঠিক তখনি আমি (দিগন্ত) বললাম,

— “ভাই… আসলে একটা কথা বলি?”

সবাই তাকাল ।

বললাম..... যে,

— “Reply All-টা আমি পাঠাইনি । কিন্তু যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি পরে আমাকে বলেছিলেন— ‘Undo Send’ কোথায় পাই?”

পুরো রুম আবার হাসিতে ফেটে পড়ল ।

আমি শান্তভাবে বললাম,

— “পরেরবার পাঁচ সেকেন্ডের বদলে ত্রিশ সেকেন্ড Undo Send চালু করে দেব ।”

-আবার সবার মধ্যেই হাসি ।..........

দিনের শেষে মুকুল স্যার বললেন,

— “একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য হলো-পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, বিশ্বাস, কাজ করার দক্ষতা আর আনন্দঘন পরিবেশ—এই বিষয়গুলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।” সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধই আমাদের অফিসকে একটি পরিবার করে তুলেছে।"

আমি (দিগন্ত) চারদিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম;

—অফিসে পদবি আলাদা হতে পারে । কিন্তু সকলেই স্ব স্ব কর্মস্থলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, নীতিমালা করে, বিশেষ দক্ষতায়, কেউ প্রযুক্তি জ্ঞানে, কেউ সম্পর্ক দিয়ে, আবার কেউ এক কাপ চা/কফি কিংবা ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপহার দিয়ে কর্মদিবসকে সুন্দর করে তোলেন । সব মিলিয়েই আমাদের অফিস, আমাদের পরিবার ।


সৌজন্যে-

দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস

২ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭ ।

মোবাইল: 01717-113087

ইমেইল: digantaroy295@gmail.com


No comments:

Post a Comment