“স্যার থেকে
ভাই—এক ঐতিহাসিক পদোন্নতি!”
আমি দিগন্ত
কুমার রায়। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কর্পোরেট অফিসে যখন প্রথম যোগদান করি, তখন আমার
কাছে অফিস মানেই ছিল—যাকে দেখি, তাকেই “স্যার”।
সকালে অফিসে ঢুকেই সবাইকে বলতাম—
—“সুপ্রভাত স্যার! কেমন আছেন ?”
ডানদিকে তাকিয়ে—
—“স্যার, কোন কাজটি আগে করবো?”
বামদিকে তাকিয়ে—
—“স্যার, এই ফাইলটা আপডেট করতে হবে কি না?”
ফলাফল এমন দাঁড়ালো যে, একদিন অফিসে যদি তিনজন একসাথে
দাঁড়িয়ে থাকতেন, আমি একবার “স্যার” বললেই তিনজনই একসাথে উত্তর দিতেন—
—“হ্যাঁ দিগন্ত, বলেন!”
আমি তখন বুঝতেই পারতাম না, আসলে কোন স্যারকে ডাকলাম!
আমাদের রুমে তখন অফিসিয়াল ডেস্ক ছিল ফাহাদ ভাই, ইমতিয়াজ ভাই, শিহাব ভাই এবং রুদ্র
ভাইয়ের।
একদিন দুপুরে ফাইল আপডেট করতে গিয়ে ফাহাদ ভাইকে বললাম,
—“স্যার, একটি কাগজে স্বাক্ষর প্রয়োজন।”
অন্যদিকে ইমতিয়াজ
ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“দিগন্ত, একটা প্রশ্ন করি?”
আমি একটু ভয় পেলাম।
—“জি… স্যার!”
তিনি হেসে বললেন,
—“দ্যাখেন, আমরা যদি আপনাকে ভাই মনে করি, আর আপনি
যদি আমাদেরকে স্যার ডাকেন, তাহলে সমীকরণে ভারসাম্য থাকে?”
আমি হতচকিত হয়ে বললাম,
—“সম্ভবত থাকে না… স্যার!”
রুমজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।
এবার তিনি অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে ঘোষণা দিলেন,
—“একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সভা এখনই হোক।”
আমি তো প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম!
তিনি বললেন,
—“এজেন্ডা একটাই—দিগন্ত, এখন থেকে সবাইকে ‘ভাই’ ডাকতে
পারবে কি না ?”
রুদ্র ভাই সঙ্গে সঙ্গে
বললেন,
—“আমি মিডিয়ার লোক। এই সংবাদটি ইতিবাচকভাবে প্রচার
করা উচিত। জনগণ জানতে চায়!”
আবার হাসির ঢেউ।
ফাহাদ ভাই বললেন,
—“আমি প্রস্তাব সমর্থন করছি।”
এদিকে শিহাব
ভাই বললেন,
—“কারো আপত্তি থাকলে এখনই জানান। পরে কিন্তু আপিল
গ্রহণ করা হবে না!”
আমি তখনও যেন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।
কেউ কোনো আপত্তি করল না।
ইমতিয়াজ ভাই টেবিলে কলম
ঠুকে বললেন,
—“সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। আজ থেকে দিগন্ত
সবাইকে ভাই বলবে।”
আমার মনে হলো, যেন চাকরিতে দ্বিতীয়বার নিয়োগপত্র পেলাম!
ইমতিয়াজ ভাই বললেন,
—“ভাই
ডাকেই দায়িত্ব বেশি, সম্মানও বেশি।”
তারপর শিহাব
ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
—“শিহাব ভাই।”
তিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
—“অভিনন্দন! আজ থেকে আপনি আমাদের ভাই ব্রাদারহুডের
স্থায়ী সদস্য। ভর্তি ফি নাই!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কয়েকদিন পর এইচ.আর.এম এন্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের
পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল স্যারের
কক্ষে কাজের প্রয়োজনে গেলাম।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
—“শুনেছি তোমার পদোন্নতি হয়েছে!”
আমি অবাক।
—“স্যার! আমি তো কোনো পদোন্নতি পাই নাই!”
তিনি হেসে বললেন,
—“পদবি নয়, সম্বোধনের পদোন্নতি। স্যার থেকে ভাই—এটাও
কিন্তু কম কিছু নয়।”
ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন।
এর কিছুদিন পর এক বিকেলে শিহাব ভাইয়ের রুমে গেলাম।
ঠিক তখনই মো.
সিদ্দিকুর রহমান সুমন স্যার আসলেন।
দরজা খুলেই বললেন,
—“আরে! তোমরা এখনো শুধু গল্প করছো? চলো, আমার রুমে।
খালি পেটে মিটিং করলে সিদ্ধান্ত উল্টো হয়ে যায়!”
তার সেই মজার আঞ্চলিক ভঙ্গির কথায় সবাই হেসে উঠল।
আমরা গেলাম।
টেবিলে দেওয়া হলো চা, কফি, সিঙ্গারা, সমুচা, কেক,
ফল আর ঠান্ডা পানীয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—“স্যার, এত আয়োজন কেন?”
সুমন স্যার হাসতে হাসতে
বললেন,
—“রাজনীতি শিখিয়েছে—মানুষের মন জিততে হলে আগে পেট
জিততে হয়!”
ঠিক তখনই রুদ্র
ভাই মোবাইল তুলে বললেন,
—এই দৃশ্যের একটা ছবি হলে দারুণ হতো। ক্যাপশন দিতাম—‘ভাই
সম্বোধনের ঐতিহাসিক চুক্তি উদ্যাপন!’
ফাহাদ ভাই সঙ্গে সঙ্গে
বললেন,
—ক্যাপশনটা সংশোধন করেন। লিখেন—‘অফিসে সম্মান কমেনি,
দূরত্ব কমেছে।’
ইমতিয়াজ ভাই মাথা নেড়ে
বললেন,
—এই কথাটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
আমি চারদিকে তাকালাম।
যাদের একসময় “স্যার” বলে ডাকতাম, আজ তারা সবাই আমার
“ভাই”।
সম্বোধন বদলেছে, কিন্তু সম্মান একটুও কমেনি।
বরং সেই একটিমাত্র শব্দ—“ভাই”—অফিসের সম্পর্ককে
আরও আন্তরিক, আরও মানবিক করে তুলেছে।
আর আজও যখন নতুন কেউ অফিসে এসে সবাইকে “স্যার” বলে
ডাকে, তখন আমার দিকে তাকিয়ে ফাহাদ ভাই
মুচকি হেসে বলেন—
—দিগন্ত,
প্রস্তুত হন। মনে হচ্ছে আবার একটি ‘ঐতিহাসিক ভাই অনুমোদন সভা’ ডাকতে হবে!
এরপর পুরো অফিসে একসাথে যে হাসির শব্দ ওঠে, সেটাই
বুঝিয়ে দেয়—কর্মক্ষেত্র শুধু কাজের জায়গা নয়, সুন্দর সম্পর্কেরও এক অনন্য ঠিকানা।
সৌজন্যে-
দিগন্ত কুমার রায়
জুনিয়র এইচ.আর. অফিসার
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, কর্পোরেট অফিস
২ বড় মগবাজার,
ঢাকা-১২১৭ ।
মোবাইল:
01717-113087
ইমেইল: digantaroy295@gmail.com